ব্রেকিং নিউজ
সিনথিয়া আফরোজ
১৮ মে ২০২৬, ৩:৫৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ময়লা টানেন তাঁরা, পকেট ভরেন নেতারা

কারও বেতন মাসে ১০ হাজার, কেউ পান ১৭ হাজার টাকা। আবার কারও বেতন নেই, শুধু ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে চলতে হয় তাঁদের।

বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ময়লা নিয়ে অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছেন দুই কর্মী। গত শনিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারসংলগ্ন পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁর উচ্ছিষ্ট পচা–বাসি খাবার, ভাঙা প্লাস্টিক, বোতল, বস্তা আর নোংরা পলিথিনে যেন উপচে পড়ছে রিকশা ভ্যানটি। সেই ভ্যান শরীরের সবটা শক্তি দিয়ে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দুজন একজন তরুণ, আরেকজন কিশোর। ভ্যান থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে আশপাশের পথচারীরা তাঁদের পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের থামার সুযোগ নেই। যত কষ্টই হোক, ভ্যানভর্তি ময়লা পৌঁছাতে হবে নির্ধারিত জায়গায় (অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র বা এসটিএস)।

গত শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর পান্থকুঞ্জ পার্কের পাশের সড়কে কথা হয় ওই দুজনের সঙ্গে। ভ্যানচালকের নাম রুবেল। আর তাঁর সঙ্গে থাকা কিশোর সহযোগীর নাম সাইদুর। দুজনে মিলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকটি সড়কের আশপাশের বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁ থেকে ময়লা সংগ্রহ করেন।

রুবেল ও সাইদুরের কাজ শুরু হয় প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে। কাজ শেষ করতে করতে বাজে বিকেল ৪টা-৫টা। ময়লা সংগ্রহের যে প্রতিষ্ঠানে (ভ্যান সার্ভিস নামে পরিচিত) রুবেল কাজ করেন, সেখান থেকে মাসে বেতন পান ১৩ হাজার টাকা। আর সাইদুর বেতন পায় ১০ হাজার টাকা।
রুবেল মা ও ভাইকে নিয়ে থাকেন কাঁঠালবাগান এলাকায়। এক কক্ষের যে বাসায় থাকেন তাঁরা, এর ভাড়া মাসে আট হাজার টাকা।

কথায়-কথায় রুবেল জানান, সংগ্রহ করা ময়লার মধ্যে পাওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ ও বিভিন্ন ধরনের ধাতব পণ্য আলাদা করে বিক্রি করেন। এসব পণ্য (ভাঙারি) বিক্রি করে মাসে আরও ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আসে। সেই টাকা তিনি আর সাইদুর ভাগ করে নেন।

রুবেল বলেন, ময়লার কামে ম্যালা কষ্ট…দিনে ৯-১০ ঘণ্টা রাস্তায় কাটাই। মাস শেষে যে টেকা পাই, সেইডাতে পোষায় না। থাকন আর খাওনেই ম্যালা খরচা। কিন্তু কাম না করলে খামু কী?

ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে তাঁরা পান ২২ টাকা। একটি ভ্যান থেকে দিনে প্রায় ১০ কেজির মতো বিক্রিযোগ্য ভাঙারি পণ্য পাওয়া যায়।
রুবেল-সাইদুরের মতো আরও অনেক তরু–কিশোর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ করেন। বেশির ভাগ এলাকায় এ কাজটি ভ্যান ঠেলে ঠেলে করতে হয়। এ কাজ যাঁরা করেন, তাঁরা ভ্যান সার্ভিস কর্মী নামে পরিচিত। তাঁদের কাজ বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে তা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত এসটিএসে নিয়ে যাওয়া। সেখান থেকে ময়লা-আবর্জনা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ল্যান্ডফিলে (ময়লা ফেলার কেন্দ্রীয় ভাগাড়) নেওয়া হয়।

দক্ষিণ সিটির অন্য ওয়ার্ডগুলোতেও ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের বেতন মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে বাড়তি কিছু টাকা পান তাঁরা।

ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে তাঁরা পান ২২ টাকা। একটি ভ্যান থেকে দিনে প্রায় ১০ কেজির মতো বিক্রিযোগ্য ভাঙারি পণ্য পাওয়া যায়।

বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ করা ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো এসব শর্ত ঠিকমতো মানছে কি না, তা সেভাবে তদারক করা হয় না। এটি অস্বীকার করে লাভ নেই। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে ভবিষ্যতে যাতে এসব শর্ত মানতে বাধ্য হয় ভ্যান সার্ভিসগুলো। আরেকটা বিষয়, সিটি করপোরেশন থেকেও একবার ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের মাস্ক ও গামবুট দিয়েছিল; ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া কিন্তু তারা ঠিকমতো ব্যবহার করেনি।
সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর ময়লা সংগ্রহের কাজ করা কর্মীরা মাসে যে টাকা পান, তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে। যদিও তাঁদের ঘাম আর পরিশ্রমে মাসে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করেন যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের কিছু নেতা-কর্মী। অন্যদিকে নির্ধারিত ফির (মাসে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা) বাইরে ময়লার বিলের জন্য বাড়তি টাকা দিতে হয় নগরবাসীকে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বনানী এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ময়লার বিল নেওয়া হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেখানে ময়লা–বাণিজ্য থেকে মাসে আদায় হয় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অথচ যাঁদের দিয়ে বাসাবাড়ি ও হোটেল রেস্তোরাঁর ময়লা সংগ্রহ করা হয়, তাঁদের কেউ মাসে সামান্য বেতন পান, কেউবা বেতনের পরিবর্তে শুধু ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে চলেন।

ময়লা সংগ্রহের কাজ করা কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও তেমন কোনো আলোচনা হয় না। ময়লা সংগ্রহের কাজ করা ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সিটি করপোরেশনের নির্দেশনায় বলা আছে, বর্জ্য সংগ্রহকারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি রোধে মাস্ক, হাত মোজা, গামবুট ব্যবহার করতে হবে। এই কাজে কোনো শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা যাবে না। বর্জ্য সংগ্রহের সময় ভ্যানের ওপর অবশ্যই ত্রিপল বা ঢাকনা ব্যবহার করতে হবে। তবে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন এলাকায় এসব শর্তের কিছুই মানা হয় না।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ করা ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো এসব শর্ত ঠিকমতো মানছে কি না, তা সেভাবে তদারক করা হয় না। পি এটি অস্বীকার করে লাভ নেই। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে ভবিষ্যতে যাতে এসব শর্ত মানতে বাধ্য হয় ভ্যান সার্ভিসগুলো।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত

১

৯০ দশকের পদ্মা’ কাঁপানো নায়ক সৌম্য চৌধুরী এখন কেন রাস্তার ভবঘুরে: কী হয়েছিল অভিনেতা সৌম্য চৌধুরীর জীবনে?

২

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে জেলায় শ্রেষ্ঠ সোনাগাজীর ইউএনও মারজান হোসাইন

৩

দেশ গড়ার সংগ্রামে ধর্মীয় নয়, নাগরিক পরিচয়ই মুখ্য: প্রধানমন্ত্রী

৪

পদত্যাগের নির্দেশ নিয়ে গুজবে চটেছেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক

৫

তিন বছর অপেক্ষার পর যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড পেলেন মৌসুমী

৬

শান্তিরক্ষীদের ওপর ইসরায়েলি হামলায় কাতারের তীব্র নিন্দা

৭

নতুন সিনেমার অপেক্ষায় মন্দিরা চক্রবর্তী

৮

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৬নং চরচান্দিয়া ইউনিয়ন শাখা কমিটি গঠন

৯

সোনাগাজীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

১০

চৌদ্দগ্রামে বিজিবি’র বিশেষ অভিযান: মাইক্রোবাসসহ ৩৯ লাখ টাকার ভারতীয় মালামাল জব্দ

১১

শারদীয় দুর্গোৎসব ২০২৬: মহা প্রস্তুতির মাঝে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব

১২

ফেনী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নুরজাহান সিন্ডিকেটের ‘রাজত্ব’: জিম্মি নার্স ও রোগীরা, নেপথ্যে বিপুল অর্থবাণিজ্য

১৩

সোনাগাজী-দাগনভূঞায় ৪২টি পূজা মণ্ডপে পরিবেশ মন্ত্রীর আর্থিক অনুদান প্রদান

১৪

দল মনোনীত প্রার্থীর বাইরে কেউ ভোট করলে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে দল, নির্বাচন নিরপেক্ষ করবে সরকার: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী

১৫

এসএসসি পরিক্ষায় দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের পরীক্ষা নেওয়া হবে ১৫ দিনের মধ্যে, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

১৬

​সোনাগাজীতে মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা খুরশীদ আলম ভূইয়ার

১৭

মাদকমুক্ত ও সমৃদ্ধ ‘মডেল চরচান্দিয়া’ গড়ার দীপ্ত অঙ্গীকার শামছুদ্দিন খোকনের

১৮

০৭ নং ওয়ার্ডকে মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাংমুক্ত মডেল ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়।এনায়েত উল্যাহ

১৯

৩ বছরের মধ্যে সড়ক নষ্ট হলে নিজ খরচে মেরামত করবেন ঠিকাদার: প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ

২০